মাহমুদ হাসান
ক্রাইম রিপোর্টার
নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের বাসা থেকে কোটি কোটি টাকা, সোনাদানা ও বৈদেশিক মুদ্রা লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত ময়মনসিংহের গাড়িচালক মো. রাসেল মিয়ার অলৌকিক উত্থানের কাহিনী এবার রূপ নিয়েছে সিনেমার গল্পে। লুটপাটের থলের বিড়াল খোদ রাসেলের সাবেক স্ত্রীর অডিও কলে ফাঁস হওয়ার পর, ঘটনা ধামাচাপা দিতে ও সত্য গোপন করতে সাংবাদিকদের নামে মিথ্যা মামলা ও সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে রাসেলের বিরুদ্ধে।
লুটের টাকায় চর বড়বিলায় রাতারাতি কোটিপতি
অনুসন্ধানে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালী থানার চর খরিচা বাজার ডাকঘরের অন্তর্গত চর বড়বিলা এলাকার মো. আব্দুল বারেকের ছেলে মো. রাসেল মিয়া দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জের সেলিম ওসমানের ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের ঠিক দুদিন আগে, ওসমানের পরিবার গা-ঢাকা দিলে মালিকপক্ষের অনুপস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নিয়ে চালক রাসেল ও তার ভাই ওই বাসা থেকে কোটি কোটি টাকা ও সোনাদানা লুটপাট করে চম্পট দেন।
ভ্যানচালক ভাই আর পুরনো কাপড় বিক্রেতা বাবার সন্তান রাসেল এই লুটের টাকায় ময়মনসিংহের চর বড়বিলা এলাকায় এসে রাতারাতি ‘গায়েবি ধনী’ বনে যান। কিনতে শুরু করেন বিঘার পর বিঘা জমি ও দামি গাড়ি। এলাকায় প্রভাব খাটাতে দুহাতে টাকা ওড়ানোসহ আগামীতে নির্বাচন করারও ঘোষণা দেন তিনি।
বাউল গানের আসর, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ৪-৫ জন বডিগার্ডের পাহারা
বিপুল অর্থের গরমে এলাকায় এখন রাজকীয় হালে চলেন রাসেল। সাধারণ মানুষের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে সবসময় তার চারপাশ ঘিরে রাখে ৪ থেকে ৫ জন লাঠিয়াল বডিগার্ড (দেহরক্ষী)। এই বডিগার্ড বাহিনী নিয়েই তিনি এলাকায় চলাচল করেন। শুধু তাই নয়, টাকার গরমে এলাকায় নিয়মিত বড় বড় বাউল গানের আসর বসাতেন রাসেল। অভিযোগ রয়েছে, এই বাউল গানের আসরের আড়ালে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আসর বসাতেন তিনি। সেখানে এক নারী বাউল শিল্পীর প্রতি রাসেলের আসক্তি তৈরি হলে ঘরে থাকা স্ত্রীর সাথে চরম বিরোধ তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে টাকার অহংকারে স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন রাসেল।
সাবেক স্ত্রীর অডিও কলে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস ও এলাকাবাসীর সাক্ষ্য
বিবাহবিচ্ছেদের পর ক্ষোভে ও ক্ষোভের মুখে রাসেলের সাবেক স্ত্রী সাংবাদিকদের সাথে অডিও কলে যুক্ত হয়ে ওসমানের বাড়ি লুটপাটের সমস্ত ভেতরের গোপন তথ্য, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এবং রাসেলের কুকীর্তি বিস্তারিতভাবে ফাঁস করে দেন। সাংবাদিকরা মাঠে নেমে অনুসন্ধান করলে চর বড়বিলা এলাকার বাসিন্দারাও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দেন যে, অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের এই ছেলে হঠাৎ করে কীভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হলো! এলাকাবাসী সরাসরি রাসেলের এই সম্পদকে ‘গায়েবি ও অবৈধ অর্থ’ এবং ‘লুটের টাকা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
সাংবাদিকদের নামে মিথ্যা মামলা ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী দিয়ে হুমকি
নিজের এই বিশাল কুকীর্তি, আমোদ-প্রমোদ ও ওসমানের বাসা লুটের কাহিনী সংবাদমাধ্যমে চলে আসার ভয়ে এবং সত্য গোপন করার উদ্দেশ্যে রাসেল এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সত্য প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে ও ভয় দেখাতে তিনি আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন।
শুধু মামলা দিয়েই ক্ষান্ত হননি রাসেল, সাংবাদিকদের বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ওসির ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে। রাসেল ও তার লোকজন সাংবাদিকদের হুমকি দিয়ে বলেন, “থানার ওসি আমাদের লোক, আমাদের পেছনে বড় বড় সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। রাসেলের বিষয়ে কিছু লিখতে হলে যেন বুঝেশুনে লেখা হয়, নাহলে সাংবাদিকদের পরিণতি খারাপ হবে।” এলাকায় বিভিন্ন বহিরাগত সন্ত্রাসী এনে সাংবাদিকদের রেকি করা ও ভয় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে ওসমানের বাড়ি লুটের কোটি কোটি টাকা উদ্ধার এবং সাংবাদিকদের মিথ্যা মামলা ও সন্ত্রাসী দিয়ে হয়রানি ও হুমকিদাতার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন ময়মনসিংহের সচেতন মহল ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
