আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে এক অনন্য ইতিহাস গড়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নারী আবের কাওয়াস। তিনি অঙ্গরাজ্যের সিনেটের ১২ নম্বর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে এই বিজয় অর্জন করেন এবং আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। একই সঙ্গে হিজাব পরিহিত প্রথম নারী প্রতিনিধি হিসেবেও নিউইয়র্কের আইনসভায় পা রাখতে চলেছেন তিনি। প্রাথমিক ভোট গণনার ফলাফলেই তার বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় এবং তার এই সাফল্য মার্কিন রাজ্য রাজনীতিতে আরব ও ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবেরই স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজয়ের পর নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান যে তারা সফলভাবে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছেন।
নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময়জুড়ে আবের কাওয়াস বেশ কিছু জনকল্যাণমুখী ও প্রগতিশীল এজেন্ডা ভোটারদের সামনে তুলে ধরেন। তার প্রচারণার মূল স্লোগান ছিল মর্যাদায় বিনিয়োগ এবং ধ্বংসের বিরুদ্ধে লড়াই, যার মাধ্যমে তিনি সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন সুবিধা দেওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। মার্কিন রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্য হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী অভিবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং বিদেশি যুদ্ধে অর্থায়ন বন্ধ করার জোরালো দাবি জানান। তার এই প্রগতিশীল অবস্থানের কারণে ডেমোক্রেট শিবিরের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিক তাকে সমর্থন জানান এবং তার পক্ষে জোরালো প্রচার চালান।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে কাওয়াস দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে শ্রমিকদের অধিকার, অভিবাসী সম্প্রদায় এবং ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার রক্ষায় একজন তৃণমূল সংগঠক হিসেবে নিরলস কাজ করে গেছেন। তিনি মূলত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক দখলদারত্ব এবং অবৈধ বসতি স্থাপন কার্যক্রমে মার্কিন দাতব্য সংস্থাগুলোর তহবিল জোগানের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। স্থানীয় অলাভজনক সংস্থাগুলো যাতে ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা দিতে না পারে, সেজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট আইন প্রণেতাদের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যদিও সেই সময় আইনপ্রণেতাদের প্রবল বিরোধিতার মুখে বিলটি পাস করানো সম্ভব হয়নি, তবুও ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সেটি ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ। এছাড়া তিনি নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের সঙ্গে ইসরায়েলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি ও নজরদারি ব্যবস্থারও তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা কাওয়াসের জীবন এবং রাজনৈতিক দর্শন গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে তার পারিবারিক অভিবাসন পটভূমি দ্বারা। নব্বইয়ের দশকে ফিলিস্তিন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো তার বাবা-মায়ের বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও শৈশবে তিনি নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপদ বোধ করতেন। কিন্তু ২০০১ সালের সন্ত্রাসী হামলার পর নিউইয়র্কের মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নজরদারি ও নানা হয়রানি বৃদ্ধির কারণে সেই পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। হাইস্কুলে পড়ার সময় তার বাবাকে অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আটক করে জর্ডানে ফেরত পাঠানো হলে তার পরিবারে চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকট তৈরি হয়। সেই ব্যক্তিগত কষ্টের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় অত্যন্ত সোচ্চার হয়ে ওঠেন এবং অঙ্গরাজ্য সরকারের সঙ্গে ফেডারেল অভিবাসন সংস্থার সহযোগিতা বন্ধ করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। ফিলিস্তিনি পরিচয়কে কখনো আড়াল না করে তিনি সবসময় ফিলিস্তিনের জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচারের পক্ষে সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজের অবস্থান অটুট রেখেছেন।
