নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রতি অর্থবছরেই কোটি কোটি টাকার বিপুল বাৎসরিক লোকসানের মুখোমুখি হতে হয় বাংলাদেশ রেলওয়েকে। এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির পেছনে জরাজীর্ণ অবকাঠামো বা জ্বালানি খরচের চেয়েও বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে টিকেটবিহীন ভ্রমণ, টিটিআই (ট্রেন টিকিট পরিদর্শক) ও মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের অনিয়ম এবং জরিমানা থেকে আদায়কৃত অর্থ রাজস্ব ভাণ্ডারে জমা না হওয়া। রেলওয়ের এই চলমান আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সবচেয়ে কার্যকর ও আধুনিক সমাধান হতে পারে সকল টিটিআই এবং মাঠপর্যায়ের রেলকর্মীদের জন্য সার্বক্ষণিক ‘বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা’ (Body Camera) বাধ্যতামূলক করা।
লোকসান বন্ধে বডি ক্যামেরা যেভাবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে
টিকেটবিহীন যাত্রী নিয়ন্ত্রণ ও শতভাগ ভাড়া আদায়: প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী টিকেট ছাড়াই ট্রেনে ভ্রমণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মিত লেনদেনের মাধ্যমে টিকেট না কেটেই যাতায়াত সমন্বয় করা হয়। বডি ক্যামেরা চালু হলে প্রতিজন যাত্রীর টিকেট চেকিং প্রক্রিয়া সরাসরি রেকর্ড হবে, ফলে অসাধু উপায়ে যাত্রীদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: ক্যামেরা চালু থাকা অবস্থায় টিটিআই বা রেলকর্মীরা ঘুষ বা অসদুপায়ে লেনদেনে জড়াতে পারবেন না। রেকর্ড করা ফুটেজ সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারে মনিটর করা সম্ভব হবে, যা কর্মীদের মধ্যে সর্বোচ্চ সততা নিশ্চিত করবে।
অন-স্পট জরিমানার অর্থ সরকারি তহবিলে জমা: টিকেটবিহীন যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা জরিমানা এবং অতিরিক্ত ভাড়ার অর্থ সরাসরি ই-টিকিটিং ও ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। মাঝপথে কোনো অর্থ আত্মসাতের সুযোগ থাকবে না।
যাত্রী ও স্টাফদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি: ট্রেনে মাঝেমধ্যেই বগিতে যাত্রী ও রেলকর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা, হামলা বা হয়রানির ঘটনা ঘটে। বডি ক্যামেরা থাকলে উভয় পক্ষই অসংযত আচরণ করা থেকে বিরত থাকবে, যা অপরাধ কমাতে সরাসরি সাহায্য করবে।
বাস্তবায়ন ও প্রযুক্তিগত কৌশল
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিশাল রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ করতে দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে মনিটরিং: প্রতিটি ক্যামেরায় জিপিএস (GPS) ও লাইভ স্ট্রিম বা লোকাল স্টোরেজ রেকর্ড সুবিধা রাখা।
কঠোর অডিট ব্যবস্থা: টিটিআই-দের ডিউটি শেষে ক্যামেরার রেকর্ড করা ফুটেজের সাথে টিকিট বিক্রির রসিদ মিলিয়ে দেখা।
ডিজিটাল ডিভাইস ও বডি ক্যামেরার সমন্বয়: হ্যান্ডহেল্ড পিওএস (POS) মেশিনের সাথে বডি ক্যামেরা যুক্ত করে তাৎক্ষণিক রসিদ ও শতভাগ রাজস্ব নিশ্চিত করা।
উপসংহার
বডি ক্যামেরা ক্রয়ে প্রাথমিকভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হলেও, এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের হাজার কোটি টাকার সিস্টেম লস ও দুর্নীতি এক লহমায় বন্ধ করে দিতে পারে। স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে খুব দ্রুতই বাংলাদেশ রেলওয়ে লোকসান কাটিয়ে একটি লাভজনক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে।
