কাওছার আহমেদ,
সহসম্পাদক
জামালপুরে ভুল চিকিৎসায় এক সরকারি কর্মকর্তার জীবন সংকটাপন্ন করার অভিযোগে বেসরকারি এম.এ রশিদ হাসপাতালে কর্মরত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) জামালপুর আদালতে ভূক্তভোগী রোগী সাবেরী শারমিন বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি আমলে নিয়ে সিভিল সার্জনকে তদন্তের আদেশ দিয়েছে আদালত।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার সাবেরী শারমিন চলতি বছরের ২০ জানুয়ারী তলপেটে ব্যাথা নিয়ে জামালপুরের বেসরকারি এম.এ রশিদ হাসপাতালে ভর্তি হন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগীর ডিম্বনালী ও ডিম্বাশয়ের চারপাশে সংক্রমণ হয়েছে এবং ডান পাশের ডিম্বাশয়ে রক্তভর্তি সিস্ট রয়েছে বলে জানানো হয় এবং চিকিৎসকরা তাকে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। পরে ২৯ জানুয়ারী এম.এ রশিদ হাসপাতালের গাইনী চিকিৎসক ডা.সাবরিনা বরকত ও জেনারেল সার্জন ডা.মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের তত্ববধানে সাবেরী শারমিনের অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু অস্ত্রোপচারের সময় রোগী বা স্বজনদের অনুমতি না নিয়ে জরায়ু ও ডিম্বাশয় কেটে ফেলা হয়। তবে জরায়ু ও ডিম্বাশয় সম্পুর্ণ অপসারণ না করায় কিছু অংশ ভেতরে থেকে যায় এবং ইনফেকশনের করণে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। এরপর আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকরা আবারও অস্ত্রোপচারের কথা জানালে রোগী এম.এ রশিদ হাসপাতাল ত্যাগ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে সেখানে গত ৫ ফেব্রুয়ারী দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার করে সংক্রমিত তরল ও পূজ বের করা হয় এবং প্রথম অস্ত্রোপচারের ত্রুটির বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এতে ইনফেকশন দূর হলেও রোগী পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় ভারতের চেন্নাইয়ে একটি হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা নিতে যান। ভারতের ওই হাসপাতালটিতে গত ২৩ মার্চ তৃতীয় দফায় সাবেরী শারমিনের অস্ত্রোপচার করা হয়। সর্বশেষ ২০ জুন ভারতের ওই একই হাসপাতালে চতুর্থ দফায় অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
এই ঘটনায় গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) জামালপুর আদালতে মামলা দায়ের করেন ক্ষতিগ্রস্থ রোগী সাবেরী শারমিন। তিনি জামালপুর শহরের পূর্ব নয়াপাড়া এলাকায় বসবাস করেন। তার স্বামী মোহাম্মদ ফারুক হোসাইন সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের একজন শিক্ষক।
সাবেরী শারমিন বলেন, দুইজন চিকিৎসকের একটি ভুল অপারেশনের কারণে আমার ৪টি অপারেশন করতে হয়েছে। একের পর এক অপারেশন, উচ্চ মাত্রার এন্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ঔষধ প্রয়োগের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। তাই আমি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। আমি ন্যায় বিচার চাই। এম.এ রশিদ হাসপাতালে অপারেশনের জন্য ১ লাখ ৮৬ হাজার খরচ হয়েছে। কিন্তু তাদের ভুলের কারণে পরবর্তী সময়ের অপারেশন ও অন্যান্য খরচ বাবদ সব মিলিয়ে আমার ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
সাবেরী শারমিনের স্বামী মোহাম্মদ ফারুক হোসাইন বলেন, এম.এ রশিদ হাসপাতালের বাইরের চাকচিক্য দেখে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা এতটা নিম্ন মানের জানা ছিলো না। চিকিৎসকের ভুলের কারণে আমরা বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি।
বাদী পক্ষের আইনজীবী ইয়াসিন আরাফাত বলেন, ভুল চিকিৎসার অভিযোগে এম.এ রশিদ হাসপাতালের দুই জন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ও ডা. সাবরিনা বরকতের বিরুদ্ধে ভূক্তভোগী রোগী সাবেরী শারমিন মামলা রুজু করেন। জামালপুর আমলী আদালতের বিচারক মোস্তাফিজুর রহমান মামলাটি গ্রহণ করে সিভিল সার্জনকে তদন্ত করে মামলার পরবর্তী তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানের জন্য আদেশ দিয়েছেন।
নাগরিক অধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, বেসরকারি এই এম.এ রশিদ হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় রোগী মৃত্যু বা ভুল চিকিৎসায় হয়রানির ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে, কিন্তু এবারই প্রথম কোন ভূক্তভোগী মামলা দায়ের করেছে। প্রত্যাশা করি তারা ন্যায় বিচার পাবে।
অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও এই ধরণের মর্মান্তিক ঘটনার কারণ চিকিৎসকের উদাসীনতা ও অবহেলা। তাই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত দোষী চিকিৎসকের শাস্তি প্রদান ও নিয়মিত এসব হাসপাতালের কার্যক্রম তদারকি করা।
সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, আদালত থেকে আদেশের কাগজ হাতে পেয়েছি। তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।
তবে এম.এ রশিদ হাসপাতালে গিয়ে ওই দুই চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি।
